বাংলার প্রসিদ্ধ রথযাত্রাগুলির অন্যতম হুগলীর বলাগড়ের গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা
রাখী সাহা
বাংলার প্রসিদ্ধ রথযাত্রাগুলির অনতম হলো হুগলী জেলার বলাগড়ের গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা , যা এবার ২৮৬ বছরে পদার্পণ করল। এত সুউচ্চ কাঠের রথ খুব কমই দেখা যায়। এই গুপ্তিপাড়ার রথই দীর্ঘ ১ কি মি পথ অতিক্রম করে। এখানকার জগন্নাথদেবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এখানকার জগন্নাথদেবের হাত ও কান আছে। জগন্নাথদেবকে জ্ঞান মুদ্রার হাতে রাখা হয়েছে। এছাড়াও এখানে বললাম ও সুভদ্রাদেবীর বিগ্ৰহেও হাত দেখতে পাওয়া যায়।

গুপ্তিপাড়ার রথ চারতলাবিশিষ্ট , নয়টি চূড়া এবং ১৬ চাকাবিশিষ্ট এই রথের উচ্চতা প্রায় ৩৬ ফুট। এই রথটিও বাংলার নবরত্ন শৈলীতে তৈরি। এই রথযাত্রার সূচনা করেন স্বামী মধুসূদনানন্দ ১৭৪০ খ্রী: , যাকে বৃন্দাবন জিউ এর রথও বলা হয়ে থাকে। সারা বছর রথটি দাঁড় করানো থাকে বৃন্দাবনচন্দ্র মঠের পাশে আর জগন্নাথ, বলরাম , সুভদ্রাদেবীর বিগ্ৰহগুলি থাকে মঠের ভিতরে। সারা বছর এখানেই নিত্য পূজিত হন তারা।

সোজা রথের দিন জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা দেবী রথে চেপে ১ কিলোমিটার দূরে মাসির বাড়িতে যান এবং ন দিন বাদে উল্টোরথের দিন ফের তারা ফিরে আসেন মঠে ।
এই গুপ্তিপাড়ার রথকে কেন্দ্র করে খুব সুন্দর একটি প্রথা রয়েছে। উল্টোরথের আগের দিন এখানে জগন্নাথদেবের ‘ ভান্ডার লুট ‘ হয়। যা দেখতে ও প্রসাদ পেতে দূর দূরান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত ছুটে আসেন।
কথিত আছে একবার দেবী লক্ষীর সঙ্গে জগন্নাথদেবের মনোমালিন্য হয়। এরপর জগন্নাথদেব মা লক্ষ্মীকে না জানিয়ে রথে চেপে মাসির বাড়ি চলে আসেন। জগন্নাথদেব আসছেন না দেখে মা লক্ষ্মী পড়ে যান ভীষণ চিন্তায়। এরপর তিনি বৃন্দাবনের কাছ থেকে জানতে পারেন জগন্নাথদেব তার মাসির বাড়িতে গেছেন এবং সেখানে ভালো মন্দ উপাদেয় খাবার ছেড়ে আর তিনি আসতে পারছেন না ।

এতে লক্ষ্মীদেবীর মনে সন্দেহ জাগে যে তার স্বামী কোন পরকীয়ায় পড়েন নি তো?
যে লক্ষ্মীদেবীর কথা তার একবারের জন্যও মনে পড়ছে না। এরপরেই তিনি এক রাতে লুকিয়ে জগন্নাথদেবের মাসির বাড়িতে যান এবং সর্ষে পোড়া ছড়িয়ে দিয়ে আসেন। কিন্তু এর পরেও স্বামী না ফেরায় মা লক্ষ্মীর পরামর্শে বৃন্দাবন ও কৃষ্ণচন্দ্র জগন্নাথের মাসির বাড়িতে গিয়ে তিনটি দরজা ভেঙে জগন্নাথদেবের রকমারি খাবারের ভান্ডারা লুট করেন। বলা হয় এরপর ভালোমন্দ খাবার না পেয়ে জগন্নাথদেব মনের দুঃখে পরের দিনই রথে করে মা লক্ষ্মীর কাছে ফিরে যান।
এই রেওয়াজই গুপ্তিপাড়ায় বিখ্যাত ভান্ডারা লুট উৎসব। প্রতি বছর উল্টো রথের আগের দিন এখানে এই উৎসব হয়। এদিন জগন্নাথদেবের ভোগের তালিকায় থাকে গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি, কুমড়ো ভাজা, বেগুন ভাজা, ছানার রসা, ফ্রায়েড রাইস, রাবড়ী, সন্দেশ, মালপোয়া সহ ৫২ রকমের পদ। মোট ৫৫০ টি মালসা তৈরি হয় এবং এক একটি মালসায় থাকে প্রায় ৫ থেকে ৮ কেজি করে খাবার। এই খাবার লুঠ করে এদিন তা ভক্তবৃন্দের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়। রীতি অনুযায়ী ঘোষেদের ছেলেরা এই ভান্ডারা লুট করতে আসে। অগনিত মানুষ প্রতি বছর উপস্থিত হন এই ভান্ডারা লুট উৎসব দেখতে। বলা হয় এরপর আর মাসির বাড়িতে ভালোমন্দ খাবার না পেয়ে মনের দুঃখে পরের দিন সকালে দই , চিঁড়ে মুড়কি খেয়ে প্রভু বাড়ির দিকে রওনা দেন । সন্ধ্যায় সেখানে প্রভুর ভোগ হয়।

তবে এই ভান্ডারা লুটকে কেন্দ্র করে আরো একটি গল্প আছে। বৃন্দাবন চন্দ্র ছিলেন প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী। এই ভান্ডারা লুট উৎসবকে কেন্দ্র করে তিনি মঠের জন্য সবচেয়ে বলসালী লেঠেলকে বেছে নিতেন মঠ পাহারা দেবার জন্য। যে যত বেশী ভোগের মালসা লুট করতে পারবে তাকে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হতো। এই ভান্ডারা লুট উৎসব দেখতে আশেপাশের অঞ্চল থেকেও মানুষ ছুটে আসে।

