বয়সের স্বাভাবিক ক্লান্তি নাকি হৃদযন্ত্রের নীরব সংকেত
ডা: প্রদীপ কুমার দাস
(আই এম এ শ্রীরামপুর শাখার সভাপতি)
দোতলা-তিনতলা সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন। কয়েক ধাপ উঠতেই বুকের মধ্যে অস্বস্তি। হাঁপ ধরে যাচ্ছে । মাথাটা ঝিমঝিম করছে । কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বিশ্রাম না নিলে আর এগোনো যাচ্ছে না ।
আগে প্রতিদিন বাজারে যেতেন। বাজারে কেনাকাটা করে হাতে ব্যাগ নিয়ে ফিরতেন। কোন অসুবিধে হতো না। ইদানিং লক্ষ্য করছেন বেশ কিছুটা হাঁটলেই হাঁপ ধরে যাচ্ছে। ক্লান্তিতে পাদুটো নড়তেই চাইছে না। দরদর করে ঘেমে-নেয়ে একসার।

আগে প্রতিদিন হেঁটে গঙ্গার ধারে চলে যেতেন। ওখানে কিছুটা সময় বন্ধুদের সঙ্গে কাটিয়ে ফিরতেন ঝরঝরে হয়ে। এখন বেরোতে চাইছেন না ক্লান্তির ভয়ে। কিছুটা হাঁটলেই মাথাটা কেমন ঘুরতে থাকে, বুকে হাঁপ লাগে।
বাড়ির বাইরে বেরোতে চায় না মন। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে ওই নিয়ে কথা বললে জানায় আপনার এখন বয়স হচ্ছে। বয়সের ভারে ওইসব দেখা দিচ্ছে। কেউ কেউ উপদেশ দেন একবার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটা দরকার। সেইমত বিশিষ্ট হার্ট স্পেশালিস্টকে দেখিয়ে তাঁর পরামর্শ মতন রক্ত পরীক্ষা, ইসিজি, টুডি ইকোকার্ডিয়োগ্রাফি ও হৃদযন্ত্রএর আলট্রাসনোগ্রাফি করিয়েও সেরকম খারাপ কিছু না পাওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শ মতন খাবার দাবারে কিছুটা রাশ টেনে পূর্ণাঙ্গ বিশ্রামেও খুব একটা উপসর্গের রেহাই মিলেছে এমনটা নয়। হাঁটলে চললে শ্বাসকষ্ট ও ক্লান্তি থেকেই যাচ্ছে।
তবে এর কারণটি কি? চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন এর কারণ হল এইচএফপিই হার্ট ফেলিওর। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলে হার্ট ফেলিওর উইথ প্রিজার্ভড অব মাইন্ডলি রিডিউসড ইজেকশন ফ্রাকশন। বর্তমানে সারা বিশ্বজুড়ে এই ধরণের হার্ট ফেলিওর এর দাপট বেড়ে চলেছে।বর্তমান ভারতবর্ষে এর আনুমানিক সংখ্যা হল তের থেকে ছেচল্লিশ লক্ষ। প্রতি বছরে এই সংখ্যাটা বেড়ে আঠারো লক্ষের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।

মুশকিল হল সাধারণ পরীক্ষা নিরীক্ষা বা সাধারণ হার্টের স্ক্যান পরীক্ষায় এটা ধরা পড়ছে না বলে চুপিসারে রোগটা বেড়ে যাচ্ছে। লক্ষণ হল সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গেলে হাঁপ ধরা, কিছুটা হাঁটলে ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া সেইসঙ্গে ঘেমেনেয়ে একাকার। পায়ের গোড়ালির কাছটায় ফুলে যাওয়া ও সারাক্ষণ ক্লান্তি লাগা, কোন কাজ করতে না চাওয়া। এককথায় কর্মদক্ষতা কমে যাওয়া। আমাদের হৃদযন্ত্রের কাজ হল প্রতি মিনিটে বাহাত্তর বার পাম্প করে রক্তের যোগান বজায় রাখা দেহের কোষকলায়। এক্ষেত্রে পাম্প করাতে কোন সমস্যা না হলেও হৃদপেশীর অনমনীয়নতা ও শক্ত হয়ে যাওয়ার দরুণ হৃদযন্ত্রের প্রতি পাম্পে শিথীলতার সুযোগ কমে যাওয়ার ফলে আগের মতো সহজে প্রসারিত হতে পারে না।এরফলে হৃদযন্ত্রের ভিতরে ও ফুসফুসের রক্তনালিতে চাপ বাড়তে থাকে। এরফলে পায়ের গোড়ালিতে ফুলে যাওয়া, দৈনন্দিন কাজকর্মের সময়ে শ্বাসকষ্ট বোধ করা, ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া কিংবা কায়িকশ্রম করার ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতন উপসর্গ দেখা দেয়। এরসঙ্গে দোসর হিসাবে মধুমেহ রোগ বা কিডনির রোগ থাকলে সমস্যা উত্তোরত্তর বাড়তে থাকে।
প্রথমের দিকে বয়সজনিত উপসর্গ বলে এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা কিংবা সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কোন সূত্র পাওয়া যায় না বলে রোগটি ধীরে ধীরে চরম পরিনতির দিকে এগোতে থাকে অজ্ঞাতসারে। এরফলে হৃদযন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে কিডনিতে প্রদাহ সৃষ্টি করার দরুণ রক্তনালিগুলি ক্ষতিগ্রস্থ হয় সেইসঙ্গে হৃদযন্ত্রের পেশিতে ফাইব্রোসিস হয়ে পেশি মোটা ও শক্ত হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটাও চলতে থাকে ও উপসর্গগুলো ধীরে ধীরে দেখা দিতে থাকে।
সমীক্ষায় প্রকাশ পশ্চিমী দেশের তূলনায় ভারতীয়দের হৃদযন্ত্র ও রক্তনালিকার রোগ অনেক আগে থেকে শুরু হয় শুধুমাত্র সচেতনতার অভাবের জন্যে। সেইকারণে রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার কাজও দেরি হয়ে যায়। যে সময়ে রোগটা ধরা পড়ে তখন চিকিৎসাজনিত ফল পাওয়াটাও বিলম্বিত হয়। সেইকারণে এইচএফপিইএফ হার্ট ফেলিওরের দরুণ বারে বারে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন দেখা দেয় ও চিকিৎসার খরচও বাড়তে থাকে।
জীবনযাত্রার মান নীম্নমুখী হয়। রোগ জনিত জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। মৃত্যুর হারও বেশি হয়। তাই উপরে উল্লিখিত উপসর্গগুলো দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতন চললে অনেক বিপত্তি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

#follow us -News papper/ facebook page/ website
