রথযাত্রা উৎসব উপলক্ষ্যে সৈকত শহর পুরীতে উপচে পড়েছে ভিড়
রাখী সাহা
প্রতি বছরের মতো এ বছরও যথাযথ উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে পুরীতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে রথযাত্রা উৎসব। এই উপলক্ষ্যে সৈকত শহরে উপচে পড়েছে ভীড় । দেশ বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ পূণ্যার্থী রথের রশিতে টান দিতে হাজির হয়েছেন পুরীতে । উৎসবের আবহে সেজে উঠেছে পুরী ।

রীতি মেনে সকাল বেলায় মঙ্গলারতির মাধ্যমে সূচনা হয় উৎসবের। এরপর দুপুরে খিচুড়ি ভোগ গ্ৰহন করে তিন ভাইবোন রথে করে রওনা দেন মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে।, মন্দির থেকে ৩ কিমি দূরে গুন্ডিচা মন্দিরে ।একদিকে জগন্নাথ , বলরাম সুভদ্রার রথের সামনে সংগীতের সঙ্গে সঙ্গে ওড়িশি নৃত্যশিল্পীদের নৃত্য পরিবেশন আর অন্যদিকে খোল করতাল বাজিয়ে ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে মুখরিত আকাশ বাতাস । এরই সাথে সাথে ভক্তদের রথের রশি স্পর্শ করার আপ্রাণ চেষ্টা। ত্রিদেব এদিন মন্দিরের বাইরে এসে দেখা দেন তার ভক্তদের। সনাতন ধর্মে রথযাত্রার মাহাত্ম অপরিসীম।
পদ্মপুরাণ অনুসারে একবার জগন্নাথ দেবের বোন সুভদ্রাদেবী শহর ঘুরে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন দুই দাদা জগন্নাথ ও বলরামকে নিয়ে শহর পরিভ্রমণে বেরোন । ঘুরতে ঘুরতে তারা মাসির বাড়িতে গিয়ে পৌঁছান এবং সেখানে ৮দিন থেকে তারপর নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। বলা হয় তখন থেকেই নাকি রথযাত্রার পরম্পরা শুরু হয়েছে । ব্রহ্মপুরাণ ও নারদপুরাণেও একথার উল্লেখ পাওয়া যায় ।

ওড়িশার প্রাচীন পুঁথি ‘ব্রহ্মান্ডপুরাণ ‘ অনুসারে, মালব দেশের সূর্যবংশীয় রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ছিলেন পরম বিষ্ণুভক্ত। তিনি ভগবান বিষ্ণুর স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুরীতে জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন । বলা হয় জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা রথের সময় যে গুন্ডিচা মন্দিরে মাসির বাড়িতে যান , সেই গুন্ডিচা হলেন আসলে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের স্ত্রী পরম বিষ্ণুভক্ত রানি গুন্ডিচা ।
পুরীর পরম্পরা অনুসারে আজও রথের দিন পুরীর রাজা জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার রথের সামনে দাঁড়িয়ে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করেন এবং সোনার ঝাঁটা দিয়ে রথ যাওয়ার পথ ঝাঁট দিয়ে সেখানে সুগন্ধি চন্দনের জল ছিঁটা দিয়ে রথযাত্রার সূচনা করেন। ত্রিদেব এদিন ৩টি রথে চেপে মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
মাসিরবাড়ি যাওয়ার জন্য সবার প্রথমে রওনা দেয় বলভদ্রদেবের রথ । ১৪ টি চাকা বিশিষ্ট এই রথের নাম তালধ্বজ । যার উচ্চতা ৪৪ ফুট এবং লাল- সবুজ কাপড়ে মোড়া । তার রথের চারটি অশ্বের নাম তীব্র , ঘোড়া , দীর্ঘশর্মা , স্বরনাভ । অশ্বগুলি হয় কালো রঙের।মাঝখানে থাকে সুভদ্রাদেবীর রথ । ১২ চাকাবিশিষ্ট এই রথের নাম
দর্পদলন বা পদ্মধ্বজ । এই রথের উচ্চতা ৪৩ ফুট। এই রথের আবরন লাল- কালো রঙের হয় । তার রথের চারটি অশ্বের নার হলো রুচিকা , মোচিকা , জিতা ও অপরাজিতা। তার রথের অশ্বগুলি হলো লাল রঙের আর সবশেষে যায় জগন্নাথদেবের রথ । ১৬
চাকাবিশিষ্ট এই রথের নাম নন্দীঘোষ বা কপিধ্বজ । এই রথের উচ্চতা ৪৫ ফুট এবং রথের আবরন লাল- হলুদ রঙের কাপড়ে মোড়া। তার রথের চার অশ্বের নাম শঙ্খ, বলহাকা , শ্বেতা, হরিদশ্ব। সকল অশ্বই সাদা রঙের ।জগন্নাথ, বলরাম সুভদ্রা ছাড়াও তাদের সঙ্গে সহযাত্রী হিসেবে থাকেন অন্যান্য দেব-দেবীরাও। যেমন জগন্নাথদেবের সঙ্গে থাকেন মদনমোহনদেব , বলরামের সঙ্গে থাকেন রামকৃষ্ণদেব এবং সুভদ্রার সঙ্গে থাকেন সুদর্শনাদেবী।

প্রতি বছর অক্ষয় তৃতীয়ার পূর্ণলগ্ন থেকে সূচনা হয় পুরীর রথ তৈরীর কাজ। কোন রকম অত্যাধুনিক মেশিন ছাড়াই এই রথ তৈরি করা হয় আবার রথযাত্রা উৎসব সমাপ্ত হলে এই ৩টি রথই ভেঙে ফেলা হয় এবং এই কাঠ দিয়ে জগন্নাথদেবের ভোগরান্না হয় । বলা হয় জগন্নাথদেবের রথযাত্রা দর্শন অত্যন্ত শুভ , নিষ্ঠা ও ভক্তিভরে কেউ রথযাত্রায় অংশ নেন তাহলে তিনি মোক্ষলাভ করেন।


