রাখী সাহা
আজ দেশ উদযাপন করছে স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষ। দীর্ঘ প্রায় দুই শতকের ঔপনিবেশিক শাসন ও পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার সূর্যোদয় ঘটাতে সেই সময় দেশের অসংখ্য মানুষ আত্মবলিদান দিয়েছেন। সেই সংগ্রামের ইতিহাসে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অবদানও কিছু কম ছিল না। ঘরের চার দেওয়ালের গণ্ডি পেরিয়ে সেইসময় বহু নারী সাহসিকতার সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে।
কেউ সরাসরি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন , তো কেউ বিপ্লবীদের আশ্রয় দিয়ে ও গোপনে সাহায্য করেছেন । ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পরে তাদের অকথ্য অত্যাচার এবং কারাবরণও করতে হয়েছে । পুলিশের অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেও তারা কিন্তু আন্দোলনের পথ থেকে সরে দাঁড়াননি । তাঁদের সাহস, আত্মত্যাগ ও ইংরেজ পুলিশের চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করেও দেশমাতাকে শৃঙ্খল মুক্ত করার তীব্র প্রচেষ্টার ফলেই আজ আমরা স্বাধীন দেশে শ্বাস নিতে পারছি । সমাজ ও ইতিহাস হয়তো তাদের সেইভাবে মনে রাখেনি । সেই সময়কার এমনি একজন অসম সাহসী নারী ছিলেন বাংলার ননীবালা দেবী ।
১৯১৫ সালে বাঘা যতীন ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে শহীদ হলে সারা বাংলা জুড়ে বিপ্লবের ঝড় ওঠে। বাংলার যুবকরা গোপনে অস্ত্র জোগাড় করে বিপ্লবী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন যদুগোপাল মুখার্জী ,অতুল ঘোষ , রামচন্দ্র মজুমদার, অমরেন্দ্র চ্যাটার্জি প্রমুখরা । আর এই অমরেন্দ্র চ্যাটার্জির পিসিমা ছিলেন ননীবালাদেবী । যিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিধবা হয়ে পিত্রালয়ে ফিরে এসেছিলেন।
এই ননীবালাদেবীই সেই সময় স্বাধীনতা সংগ্ৰামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
বাংলায় ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনকে ধ্বংস করতে সেই সময় উঠেপড়ে লেগেছিল ব্রিটিশ পুলিশ। বিপ্লবীদের ওপর নেমে আসে নির্মম অত্যাচার ও প্রচন্ড ধরপাকড় । আর এই বিপদে ভরা পরিস্থিতির মধ্যেও ননীবালা দেবী কখনো রিষড়ায় তো কখনো চন্দননগরে বাড়িভাড়া করে থেকে ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে বিপ্লবীদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন। অত্যন্ত দক্ষতা ও নৈপুণ্যের সঙ্গে বিপ্লবীদের অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখতেন , গোপনে বিপ্লবীদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতেন।
একবার গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ব্রিটিশ পুলিশ হঠাৎ হানা দেয় কলকাতার শ্রমজীবী সমবায়ে । সেই সময় সেখান থেকে অমরেন্দ্র চ্যাটার্জি কোনমতে পালাতে সক্ষম হলেও পুলিশের হাতে ধরা পরে যান রামচন্দ্র মজুমদার। ননীবালা দেবী এইসময় রিষড়ায় বাড়িতে প্রায় দুমাস লুকিয়ে রেখেছিলেন অমরেন্দ্র চ্যাটার্জিসহ কয়েকজন বিপ্লবীকে । ওদিকে বিপ্লবীদের জন্য সেইসময় ভীষণ দরকার ছিল মাউজার পিস্তলটির । যেটি কোথায় রাখা আছে তা শুধু জানতেন রামচন্দ্র মজুমদার কিন্তু সেইসময় তিনি ছিলেন ব্রিটিশ পুলিশের হাতে বন্দী । জেলে গিয়ে সেই খবর জেনে আসার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন ননীবালা দেবী । বাল্যবিধবা ননীবালা দেবী মাথায় সিঁদুর পড়ে একমাথা ঘোমটা টেনে রঙ্গিন শাড়ি পড়ে রামচন্দ্রের স্ত্রী সেজে গেলেন প্রেসিডেন্সি জেলে রামচন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে দেখা করতে । পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে বন্দুকের হদিস জেনে আসলেন তিনি। যে যুগের কথা এটা , সেই সময় একজন বাল্য বিধবার পক্ষে এইভাবে সধবার বেশ ধারন করে অন্যের স্ত্রী সেজে পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে গোপন তথ্য জেনে আসার কাজটি অতো সহজ ছিল
না । যদিও পরে পুলিশ সবকিছু জানতে পারে ।
পুলিশের নজর এড়াতে সেই সময় বারবার নিজের বাসস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছিল তাকে । রিষড়ার পর এবার চন্দননগরে বাড়ি ভাড়া নিয়ে গৃহকর্তীর বেশে থাকতেন ননীবালাদেবী এবং বিপ্লবী নলিনীকান্ত কর , যদুগোপাল মুখার্জী, ভোলানাথ চ্যাটার্জি, বিনয়ভূষণ দত্ত প্রমুখদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। এই সময় চন্দননগরে বিপ্লবী ভোলানাথ চ্যাটার্জির বড়োপিসিও একটি পৃথক বাড়িভাড়া নিয়ে থাকতেন এবং তিনিও বিপ্লবীদের লুকিয়ে রাখতেন। বিপ্লবীরা সারাদিন দরজা বন্ধ করে থাকতেন আর অন্ধকার হলেই বেড়িয়ে পড়তেন
কাজে । আর পুলিশ এলেই নিমেষে গা ঢাকা দিতেন
তারা । এইসময় পুলিশ বেশ কয়েকবার চন্দননগরে হানা দেওয়ায় এবং ননীবালাদেবীকে নিয়ে সন্দেহ করায় বিপ্লবীরা আর তাকে এখানে রাখা নিরাপদ নয় মনে করে তাকে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
এইসময় ননীবালাদেবীর এক বাল্যবান্ধবীর দাদা পেশোয়ার যাচ্ছিলেন । তাকে অনেক অনুনয় বিনয় করায় তিনি ননীবালাদেবীকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে রাজি হন। এরপর তিনি চলে যান পেশোয়ারে । তবে এবারে পুলিশ তার সন্ধান পেয়ে পেশোয়ার থেকে তাকে গ্ৰেফতার করে। এইসময় ননীবালাদেবী কলেরায় ভুগছিলেন। অসুস্থ ননীবালাদেবীকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হয় । এরপর একটু সুস্থ হলে তাকে নিয়ে আসা হয় কাশীর জেলে। এখানে প্রতিদিন তাকে জেলগেটের অফিসে নিয়ে গিয়ে ডেপুটি পুলিশ সুপারেনটেন্ডেন্ট জিতেন ব্যানার্জি তাকে জেরা করত বিপ্লবীদের আস্তানা ও গোপন তথ্য জানার জন্য । চলত তার ওপরে অমানবিক নির্যাতন। কিন্তু কোনভাবেই ননীবালাদেবীর মুখ থেকে বিপ্লবীদের ব্যাপারে কোন তথ্য বের করাতে পারেনি। একবার তার শরীরের গোপনাঙ্গে দুবাটি লঙ্কাবাটা ঢেলে দেওয়া হয় , তিনি ছটফট করতে করতে চিৎকার করতে থাকেন । প্রচন্ড অত্যাচার সত্ত্বেও তাকে কোনভাবেই তাকে ভাঙ্গা গেলো না। অফিসার গেলেন আরোও চটে। কাশীর জেলে ননীবালাদেবীকে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো আলোবাতাসহীন এক ছোট্ট কুঠুরি ‘পানিশমেন্ট সেলে’ । তিনদিন পরপর তাকে এই কুঠুরিতে প্রায় আধঘন্টা করে ঢুকিয়ে রাখা হতো।প্রায় অর্ধমৃতের মতো অবস্থা হয়ে যায়
তার । তবুও নিস্তার নেই, অত্যাচার চলতে থাকে পুরো মাত্রায় । কিন্তু তার মুখ থেকে ব্রিটিশ পুলিশ একটা কথাও বার করতে পারেনি ।
এরপর ননীবালাদেবীকে নিয়ে আসা হয় কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে। তিনিই ছিলেন বাংলার প্রথম মহিলা রাজবন্দী। এখানে আসার পর থেকে তিনি খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিলেন। প্রতিদিন সকাল ৯টার সময় তাকে নিয়ে যাওয়া হতো গোয়েন্দা অফিসে সেখানে আই বি পুলিশের স্পেশাল সুপারেনটেন্ডেন্ট গোল্ডি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। অত্যাচারী গোল্ডী তাকে বলেন , কি করলে আপনি খাবেন বলুন । আপনাকে এখানেই থাকতে হবে । ননীবালাদেবী বলেন আমাকে সারদাদেবীর কাছে পাঠিয়ে দিন তাহলেই আমি খাবো । গোল্ডী বলেন , আপনি তাহলে এই ব্যাপারে একটি দরখাস্ত লিখুন । ননীবালাদেবী সহজ বিশ্বাসে দরখাস্ত করলেন কিন্তু তার চোখের সামনে শয়তানি বুদ্ধিতে হাসতে হাসতে সেই দরখাস্ত ছিঁড়ে ফেলে দিলেন । এবার আহত বাঘের মতো ননীবালা দেবী সপাটে একটা চর মারেন গোল্ডীর গালে । মঞ্জুর হবে না যখন লিখতে বললেন কেন ? কি ভাবেন আমাদের , আমাদের কি কোন মান সম্মান নেই। কি অসম্ভব মনের জোর , সাহস এবং তেজ।
ননীবালাদেবী খবর পেলেন, সেই সময় প্রেসিডেন্সি জেলে তার সঙ্গেই অস্ত্র আইনে তৃতীয় শ্রেণীর বন্দী হিসেবে রয়েছেন সিউড়ির দুকড়িবালাদেবী । তার অপর জেল কর্তৃপক্ষ অসম্ভব অত্যাচার করত, অমানবিক পরিশ্রম করানো হতো তাকে দিয়ে ।
ননীবালাদেবীকে অনশন ভাঙার অনুরোধ করতে এবার জেলে এলেন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব । ননীবালাদেবী বললেন একমাত্র বামুনের মেয়ের হাতের খাবার হলেই তিনি তার অনশন ভাঙবেন । তখন জেলকতৃপক্ষ দুকড়িবালাদেবীকে নির্দেশ দেন ননীবালাদেবীর জন্য রান্না করার । এইভাবে দুকড়িবালাদেবীর হাতে ভাত খেয়ে তিনি ২১ দিনের অনশন ভাঙলেন এবং দুকড়িবালাদেবীকেও জেলের অমানবিক পরিশ্রমের হাত থেকে বাঁচালেন। এরপর থেকে যতদিন পর্যন্ত তিনি জেলে ছিলেন, দুকড়িবালাদেবীর হাতে রান্না করা ভাত খেতেন ।
এরপর ১৯১৯ সালে সালে জেল থেকে মুক্তি পেলেন ননীবালাদেবী । জেল থেকে বেরিয়ে পিত্রালয়ে আশ্রয় নিতে গেলে গোঁড়া পরিবার সমাজের ভয়ে তাকে ঘরে স্থান দিতে অস্বীকার করে । আর সেইসময় তার চেনাশোনা বিপ্লবী দলের সদস্যরা পুলিশের অত্যাচারে ছিন্নভিন্ন হয়ে শেষ হয়ে
গেছে । ননীবালাদেবী মনের দুঃখে হুগলীতে একটি কুঁড়েঘরে থাকতে শুরু করেন । কোনমতে প্রদীপের সলতে পাকিয়ে , অপরের বাড়িতে রান্না করে দিন গুজরান করেছেন । আত্মীয় স্বজন পরিবার কেউ খোঁজ রাখেনি তার । এরই মধ্যে ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট দেশ স্বাধীন হয়েছে তবে স্বাধীন ভারতেও ননীবালাদেবীর খোঁজ করেননি কেউ । তিনিও মনের দুঃখে অভিমান নিয়ে
কারোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন নি । ১৯৬৭ সালে একদিন এভাবেই অভিমান নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন ননীবালাদেবী। ইতিহাস কি মনে রেখেছে এই বীরাঙ্গনাকে ?

