মঠে অগণিত ভক্ত সমাগ
অরূপ সাহা
যথাযথ মর্যাদায় কোন্নগর রাজরাজেশ্বরী সেবামাঠে সোমবার পালিত হল জগৎগুরু শঙ্করাচার্য জ্যোতিষপীঠ দ্বারোকা- সারদা পীঠাধিশ্বর স্বামী সরূপানন্দ সরস্বতীজী মহারাজের তিরোধান দিবস। এই উপলক্ষে মঠে বিশেষ পূজার্চনার আয়োজন করা হয়। দূর দূরান্ত থেকে উপস্থিত হয়েছিলেন বহু শিষ্য। এদিন ১৬ জন সন্ন্যাসী, অগণিত ব্রাহ্মণ পূজন দান ধ্যান প্রভৃতি করা হয়। এদিন মঠে আগত শিষ্য ও ভক্তদের ভোগ প্রসাদ খাওয়ানো হয়। আচার্য পন্ডিত রবিশঙ্কর দ্বিবেদী ,মঠের প্রধান পুরোহিত স্বচ্চিৎ স্বরূপ ও উপপ্রধান পুরোহিত শ্রীধর দ্বিবেদীর পরিচালনায় দিনটি যথাযথ মর্যাদার সহিত পালিত হয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শংকরাচার্য স্বামী স্বরূপানন্দ সরস্বতী মহারাজ কোন্নগর সেবা-মঠে 30 বছর আগে নিজ হাতে মা রাজরাজেশ্বরী ত্রিপুরাসুন্দরীর বিগ্রহের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ভারতীয় সনাতন ধর্ম, বেদান্তচর্চা ও আধ্যাত্মিক জগতের অন্যতম বিশিষ্ট সাধক ছিলেন জগদ্গুরু শঙ্করাচার্য স্বামী স্বরূপানন্দ সরস্বতীজী মহারাজ। দীর্ঘ সাধনাজীবনে তিনি ধর্মীয় শিক্ষা, বেদান্তচর্চা এবং সনাতন ধর্মের বিভিন্ন দিক নিয়ে মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনা জাগিয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি দ্বারকা-শারদা পীঠ এবং জ্যোতিষ পীঠের শঙ্করাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

১৯২৪ সালে মধ্যপ্রদেশের সিওনি জেলার দিঘোরি গ্রামে পোটিরাম উপাধ্যায় নামে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিকতার প্রতি গভীর আকর্ষণ দেখা যায়। মাত্র নয় বছর বয়সে ঈশ্বরসন্ধানে তিনি গৃহত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সাধুসন্তের সংস্পর্শে এসে বেদ, ধর্মশাস্ত্র ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনে বিশিষ্ট সাধক স্বামী করপাত্রি মহারাজের প্রভাবও ছিল।

তাঁর জীবন শুধু সাধনা ও ধর্মচর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও তাঁর যোগ ছিল। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেন এবং ব্রিটিশ সরকারের হাতে কারাবরণ করেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় তাঁকে একাধিকবার জেলে যেতে হয়েছিল। ফলে তাঁর জীবনযাত্রায় আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনারও একটি অধ্যায় যুক্ত হয়েছিল।

পরবর্তীকালে তিনি সম্পূর্ণভাবে সন্ন্যাসজীবনে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৫০ সালে শঙ্করাচার্য স্বামী ব্রহ্মানন্দ সরস্বতীর কাছ থেকে দণ্ডদীক্ষা গ্রহণের পর তিনি ‘স্বামী স্বরূপানন্দ সরস্বতী’ নামে পরিচিত হন। দীর্ঘ সাধনা, শাস্ত্রচর্চা এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি ক্রমশ সনাতন ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। ১৯৮০-র দশকের শুরুতে তিনি দ্বারকা-শারদা পীঠ ও জ্যোতিষ পীঠের শঙ্করাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

শঙ্করাচার্য হিসেবে তিনি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে নিজের মতামত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতেন। সনাতন ধর্মের বিভিন্ন বিষয়, ধর্মীয় পরম্পরা এবং সমাজজীবনের নানা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য শিষ্য ও ভক্ত তাঁর সান্নিধ্যে এসেছেন এবং তাঁর কাছ থেকে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। সমসাময়িক বিভিন্ন সাধুসন্তও তাঁর মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁকে দেশের বিশিষ্ট সাধকদের অন্যতম হিসেবে স্মরণ করেছিলেন।

কোন্নগরের রাজরাজেশ্বরী সেবামঠের সঙ্গে স্বামী স্বরূপানন্দ সরস্বতীজী মহারাজের গভীর সম্পর্ক বিশেষভাবে স্মরণীয়। প্রায় তিন দশক আগে তিনি এই মঠে মা রাজরাজেশ্বরী ত্রিপুরাসুন্দরীর বিগ্রহে নিজ হাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন । গঙ্গার পশ্চিম তীরে অবস্থিত এই মঠে তাঁর বেশ কিছু সময় কাটানোর স্মৃতি আজও ভক্তদের মনে অমলিন।

তাঁর শেষ জীবনের আশ্রম ছিল মধ্যপ্রদেশের নরসিংহপুর জেলার শ্রীধাম ঝোতেশ্বর আশ্রম। ২০২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ৯৯ বছর বয়সে সেখানেই তাঁর প্রয়াণ ঘটে।
তবে তাঁর প্রয়াণের পরও শিষ্য ও ভক্তদের কাছে স্বামী স্বরূপানন্দ সরস্বতীজী মহারাজের স্মৃতি ও শিক্ষা আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে কোন্নগরের রাজরাজেশ্বরী সেবামঠের মতো তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলিতে তিরোধান দিবসে ভক্তদের সমাগমে ফিরে আসে তাঁর সাধনাজীবনের নানা স্মৃতি। গুরুদেবের সান্নিধ্য, আশীর্বাদ ও ধর্মীয় আদর্শকে স্মরণ করেই প্রতিবছর ভক্তরা শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর তিরোধান দিবস পালন করেন।


follow us – newspaper/ website/facebook page
