বছরের মাত্র পাঁচ দিন রাজবাড়িতে দর্শন দেন দ্বিভুজা দেবী, বাকি সময় ব্যাঙ্কের ভল্টে কড়া নিরাপত্তায়
রাখী সাহা
পুরুলিয়া: লাল মাটির পুরুলিয়ার ইতিহাসে রাজবংশ, যুদ্ধ, লোককথা এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধন বহু পুরনো। সেই ইতিহাসেরই এক বিস্ময়কর অধ্যায় গড় জয়পুর রাজবাড়ির সোনার দুর্গাপুজো। ১০৮টি আকবরি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে নির্মিত প্রায় সাড়ে নয়শো গ্রাম ওজনের দ্বিভুজা দুর্গামূর্তি আজও এই পুজোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। বছরের অধিকাংশ সময় ব্যাঙ্কের নিরাপদ ভল্টে থাকার পর দুর্গাপুজোর সময় মাত্র কয়েক দিনের জন্য রাজবাড়িতে ফিরে আসেন দেবী।

স্থানীয় ইতিহাস ও প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৬৬৬ সালে উজ্জয়িনী থেকে রাজা জয় সিংহ তাঁর আত্মীয়-পরিজনদের নিয়ে জঙ্গলমহলের এই অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন। সে সময় এলাকায় মুন্ডা সম্প্রদায়ের প্রভাব ছিল প্রবল। খামার মুন্ডা নামে এক শক্তিশালী আদিবাসী সর্দারের সঙ্গে রাজা জয় সিংহের সংঘর্ষ হয়। পরবর্তীকালে যুদ্ধে খামার মুন্ডার পরাজয় ও মৃত্যুর পর এই অঞ্চলে জয় সিংহের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর নাম থেকেই এলাকার নাম হয় ‘জয়পুর’ বলে প্রচলিত রয়েছে।

কথিত আছে, মুন্ডাদের আরাধ্য দেবীর প্রতীক ছিল একটি খড়্গ। জয় সিংহ সেই খড়্গকে দেবীর প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে রাজবাড়িতে পূজা শুরু করেন। পরবর্তীকালে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রচলনের সঙ্গে এই আরাধনা নতুন রূপ পায়। কলাবউ-সহ দুর্গাপুজোর আয়োজন ধীরে ধীরে রাজপরিবারের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়।
এরপর রাজা কাশীনাথ সিংহের আমলে ঘটে এক অঘটন। দুর্গাপুজোর সময় আগুনে পুড়ে যায় দেবীর মাটির প্রতিমা এবং নবপত্রিকা। এই ঘটনার পর রাজপরিবারে উদ্বেগ দেখা দেয়। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, সেই রাতেই স্বপ্নে দেবীর দর্শন পান রাজা কাশীনাথ সিংহ। দেবী তাঁকে স্বর্ণবিগ্রহ নির্মাণের নির্দেশ দেন বলে জনশ্রুতি।

এরপর বারাণসী থেকে কারিগর এনে তৈরি করা হয় দেবীর স্বর্ণমূর্তি। ১০৮টি আকবরি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে নির্মিত এই প্রতিমায় ব্যবহার করা হয় প্রায় এক কেজির কাছাকাছি সোনা। পরে মূর্তিটির ওজন প্রায় সাড়ে নয়শো গ্রাম বলে প্রচলিত হয়। প্রায় দুই মণ রুপো দিয়ে নির্মিত হয় চালচিত্র-সহ দেবীর সিংহাসনও।
জয়পুরের এই দুর্গা প্রচলিত দশভুজা রূপের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে দেবী দ্বিভুজা এবং তাঁর মুখাবয়বে রয়েছে শান্ত, অভয়দাত্রী রূপ। অতীতে পশুবলির প্রচলন থাকলেও বর্তমানে সেই প্রথা বন্ধ হয়েছে। রাজপরিবারের সামরিক ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে দুর্গাপুজোর সময় এখনও অস্ত্রপূজার রীতি পালন করা হয়।

প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮৬৫ সাল থেকে জয়পুর রাজপরিবারে এই দ্বিভুজা স্বর্ণদুর্গার পুজো মহাসমারোহে শুরু হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাজপরিবারের সদস্যরা এই পুজোর দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

এই পুজোর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ১৯৭০ সালের পর। সে সময় রাজবাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। দুষ্কৃতীরা মন্দিরে থাকা বেশ কিছু মূল্যবান অলংকার লুট করে নিয়ে গেলেও সোনার দুর্গামূর্তিটি নিয়ে যেতে পারেনি। এরপরই দেবীর নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
নিরাপত্তার স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বছরের অধিকাংশ সময় দেবীকে ব্যাঙ্কের নিরাপদ ভল্টে রাখা হবে। সেই নিয়ম আজও বজায় রয়েছে। দুর্গাপুজোর সময় কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য তাঁকে রাজবাড়িতে নিয়ে আসা হয়।
ষষ্ঠীর সকালে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ব্যাঙ্কের ভল্ট থেকে দেবীকে রাজবাড়িতে আনা হয়। এরপর রাজপরিবারের ঐতিহ্য মেনে দেবীকে সোনা, মণিমুক্তা ও অন্যান্য মূল্যবান অলংকারে সাজানো হয়। শুরু হয় পুজো, যাগযজ্ঞ, হোম-সহ নানা ধর্মীয় আচার। দেবীর আগমনকে কেন্দ্র করে রাজবাড়ি চত্বরে ভিড় জমান স্থানীয় মানুষ থেকে দূরদূরান্তের দর্শনার্থীরা।
একসময় এই পুজোয় বিপুল সংখ্যক পশুবলির প্রচলন ছিল বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। প্রচলিত বিবরণে প্রায় ২০০টি পাঁঠা এবং বহু মহিষ বলির কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সেই প্রথা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে।
পাঁচ দিন ধরে রাজবাড়িতে উৎসব চলার পর আসে বিদায়ের পালা। দশমীর রাতে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে পুজোর সমাপ্তি ঘটে। এরপর আবার কড়া নিরাপত্তায় দেবীকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ব্যাঙ্কের ভল্টে। শুরু হয় পরের বছরের অপেক্ষা।
রাজবাড়ির সোনার দুর্গাকে ঘিরে তাই শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, জড়িয়ে রয়েছে জয়পুর রাজপরিবারের ইতিহাস, স্থানীয় লোককথা এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। খড়্গকে দেবীর প্রতীক হিসেবে পূজা থেকে শুরু করে স্বপ্নাদেশের কাহিনি, ১০৮ আকবরি স্বর্ণমুদ্রায় নির্মিত স্বর্ণবিগ্রহ এবং পরবর্তীকালে নিরাপত্তার কারণে ব্যাঙ্কের ভল্টে দেবীর সংরক্ষণ—প্রতিটি অধ্যায়ই এই পুজোকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়।
সারা বছর অন্তরালে থাকার পর দুর্গাপুজোর কয়েকটি দিনে রাজবাড়িতে দেবীর আবির্ভাব তাই জয়পুরবাসীর কাছে শুধু উৎসব নয়, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানও। এক বছরের অপেক্ষার পর কয়েক দিনের জন্য সোনার দুর্গার দর্শন—এই ঐতিহ্যই আজও জয়পুরের দুর্গাপুজোকে করে রেখেছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।

