ডাঃ প্রদীপ কুমার দাস
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে বর্ণা। ছোটবেলায় একই সঙ্গে ছেলে বন্ধু মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হৈ হুল্লোড় করেছে। বাদ সাধে বয়ঃসন্ধিক্ষণে পৌঁছে। হাতে পায়ে এমনকি মুখেও ছেলেদের মতন লোম বেরোতে দেখে। ছেলে বন্ধুরা ওই নিয়ে ঠাট্টা তামাসা করাতেই বর্ণা খুবই বিব্রত। স্কুলে যেতে চায় না। আয়নার সামনে দাড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা মুখ দেখতে থাকে। বাবা -মা মেয়ের ওই অবস্থা দেখে খুবই উদ্বিঘ্ন হয়ে পড়েন। ডাক্তার দেখানো হয় পালটে পালটে। হরেক রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা চলে। জানা যায় হরমোনাল বিচ্যুতির দরুণ ওই বিপত্তি। কলকাঠি নাড়ে ডিম্বাশয়ের অসুখ যার নাম পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম। ধাতৃ চিকিৎসকের চিকিৎসার সাথে সাথে ত্বক বিশেষজ্ঞের পরামর্শে লেজার থেরাপিতে সুরুহা মেলে। মানসিক অবসাদের অবসান ঘটে বর্ণার। শেষমেষ স্কুলে যেতে থাকে নিয়মিত। ছেলে বন্ধুরা আর হাসি ঠাট্টা করার সাহস পায় না।

কণিকার বয়স ১৬ এর কাছাকাছি। ঋতুচর্ক বা মাসিকের সময়ে আতঙ্কে থাকে। প্রচন্ড তলপেটে ব্যথা সেইসঙ্গে অনিয়মিত ঋতুস্রাব, কখনো কখনো অতিরিক্ত রক্তস্রাব ওকে নাজেহাল করে দেয়। স্কুলে যেতে ভয় পায়। প্রতি মাসে পাঁচ-ছয়দিন কামাই হয়। মনটা পড়ায় থিতু হতে চায় না।সব সময়েই বিষন্ন ভাব। পরীক্ষার ফলও ভাল হয় না। সব মিলিয়ে দারুণ অবসাদে কাটে। বর্তমানে ধাতৃ চিকিৎসকের পরামর্শে হরমোনাল থেরাপি করে কিছুটা উপশম হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী ওইসব উপসর্গের কারণ হল পিসিওডি বা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম যা একগুচ্ছ উপসর্গের কারণ।
পিংকি পাল। বয়স কুড়ি। কলেজে পড়ে। কামাই করে বেশ। কারণ মুখে অবাঞ্ছিত ব্রণোর ফুসকুড়ি তৎসহ ছেলেদের মতন লোমের উৎপত্তি। ব্রণগুলোকে খুটতে গিয়ে আরও বিপত্তি। বিচ্ছিরি দাগে ভর্তি মুখমন্ডল। ওই মুখ নিয়ে কি করে যায় কলেজে? তাই ড্রপ আউট। শেষমেষ ত্বক বিশেষজ্ঞের পরামর্শে মুখমন্ডলের উন্নতি। এছাড়া তাঁর পরামর্শে ধাতৃ চিকিৎসকের শরণাপন্নায় জানা যায় ওইসব উপসর্গের কারণ হল পিসিওডি বা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম যা হরমোনার বিচ্যুতির ফলে ঘটে।

অজয় ও রাখীর বিয়ে হয়েছে প্রায় দশ বছর। সব রকমের চেষ্টা সত্বেেও এখনও তাদের কোন সন্তান সন্ততি হয় নি। বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে দুজনার। জানা গেছে বন্ধ্যাত্বের কারণ রাখী পিসিওডি রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসা চলছে বিশিষ্ট ধাতৃচিকিৎকের অধীনে। তিনি আশাবাদী।
উপরের সব উপসর্গের কারণ হল পিসিওএস বা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম। একটা রোগের বহুবিধ উপসর্গ। যেমন বয়ঃসন্ধিক্ষণে হাতে পায়ে গায়ে ও মুখমন্ডলে অবাঞ্ছিত লোম, অনিয়মিত ঋতুচক্র, মাসিকের সময়ে তলপেটে অসহ্য ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তস্রাব কখনো কখনো, সাময়িক বন্ধ্যত্ব, মুখে, পিঠে, বুকে অযাচিত ব্রণর আধিক্য, স্থুলতা, মানসিক বিষন্নতা, অবসাদ ইত্যাদি।
কারণ- হরমোন নিঃসরণের বিচ্যুতি। তাই ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নিঃসরণে বাধা পায় বলে, ঋতুচক্র অনিয়মাত হয়, মুখে পিঠে গায়ে ব্রণ দেখা দেয়, লোম গজায় মুখমন্ডলে, হাতে পায়ে ও বন্ধ্যত্বের শিকার হন মহিলারা। সমীক্ষায় প্রকাশ শতকরা কুড়ি জন মহিলাই এই রোগের কবলে পড়েন।
ঝুঁকি- উচ্চ রক্তচাপ, মধুমেহ রোগ, স্থূলতা, ডিসলিপিডিমিয়া, মানসিক দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, বিষন্নতা ও মানসিক অবসাদ ও অনিদ্রার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
প্রতিকার- প্রতিদিন শুয়ে বসে দিন না কাটিয়ে কিছুটা কায়িক শ্রম করা, সকালে বা সন্ধ্যায় না থেমে কুড়ি থেকে তিরিশ মিনিট হাঁটা, সাঁতার কাটা, বেশি কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট যুক্ত খাবার থেকে বিরত থাকা, ফাস্ট ফুড, জ্যাংক ফুড এড়িয়ে চলা, প্রতিদিনের আহারে অন্যান্য খাবারের সাথে শাকসবজি, ফল ও জলের পরিমাণ ঠিক রাখা, নিয়মিত রক্তচাপ ও চিনির মাত্রা পরীক্ষা করা, ধাতৃ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হরমোনাল চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া, বিশিষ্ট ত্বক চিকিৎসকের পরামর্শে লেজার থেরাপি, ইনটেন্স পালস লাইট থেরাপি বা অপটিক বেসড হেয়ার রিডাকশন থেরাপির ফলে অবাঞ্ছিত লোমের হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। সেক্ষেত্রে অল্প বয়েসীদের মানসিক দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগের অবসান ঘটতেই পারে। তাই পিসিওএস এখন আর তেমন কোন সমস্যাই বলে বিবেচিত নয়।

