দেবীবন্দনা থেকে মানবসেবা , দাসবাড়ির পুজোর অনন্য পরম্পরা
–ডা. প্রদীপ কুমার দাস
৫৯ বছরে পা দিয়েছে এ বছরে দাসবাড়ির বনেদি সাবেকি দুর্গাপুজো। স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রয়াত অনিল কুমার দাসের হাত ধরে 1967 সালে যে দুর্গাপুজোর গোড়াপত্তন হয়েছিল আজ ৫৯ বছরে পা দিয়ে সেই সাবেকি বনেদি দুর্গাপুজো বহমান যেখানে পুজোকে কেন্দ্র করে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শী, বন্ধু-বান্ধব, সাধারণ মানুষের মিলনমেলা চলে, সম্প্রীতির উৎসবে মেতে ওঠেন সকলে।
পুজোর কটাদিন বাড়িতে যেন চাঁদের হাট বসে যায়। চলে ঘরোয়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

দুর্গোপুজো বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব যেখানে জাতি-বর্ণ-ধর্ম -শ্রেণী নির্বিশেষে সকলে ষষ্ঠী থেকে দশমী পাঁচটা দিন সকলে মেতে ওঠেন উৎসবের আনন্দে। একে মিলনোৎসব ও সম্প্রীতির উৎসবও বলা হয়।
আমাদের দাসবাড়ির দুর্গোপুজো শুরু হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। সে বছর দারুন বন্যায় চারদিক জলে ডুবে যাওয়ার কারণে কোথাও যাওয়ার উপায় ছিল না দেখে আমার বাবা প্রয়াত অনিল কুমার দাস সকলের সঙ্গে পরামর্শ করে দুর্গোপুজোর গড়াপত্তন করেন।

দুর্গোপুজোকে কেন্দ্র করে কয়েকটাদিন একসাথ হওয়াটাকে সকলে স্বাগত জানায়। একচালার ডাকের সাজে দুর্গামা তাঁর সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে হাজির হন দাসবাড়ির দুর্গাপুজোয়। আড়ম্বর, থিমের কোন বালাই ছিল না, ছিল ভক্তি ও অন্তরের টান।
গ্রামের গরীব পটুয়ার হাত ধরে তিনি ও তার সন্তানেরা চিত্রিত হতেন।
পুজোর দুমাস আগে থেকে মাটি পড়া, সাজ-সজ্জা নিয়ে আমরা ছোটরাও বিভোর হয়ে থাকতাম। স্কুলে গেলেও মনটা পড়ে থাকতো আটচালার ঠাকুরঘরে। স্কুল ছুটির পরে সন্ধ্যে পর্যন্ত ঠায় বসে বসে পটুয়াদাদার হাতের কাজকর্ম দেখতাম। পটুয়া দাদা খুব রসিক ছিলেন। হাতের কাজের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ছোট-বড় সকলের সঙ্গে রঙ্গ-ঠাট্টা-তামাসা করতেন।
আমাদেরও খুব ভালো লাগতো।

বেলতলায় অধিবেশনের দিনে মা, ঠাকুরমা, জ্যেঠিমা, কাকীমাদের ষষ্ঠিপুজোর ভীড়ে আমরা কাছে খেঁসতেই পেতাম না। সপ্তমী থেকে বাবা সকলকে কাজ ভাগ করে দিতেন। আমাদের ছোটদের ভাগে জুটতো বসে বসে মাটির ধুনুচীতে নারকেল ছোবড়ার আগুন ধরিয়ে ধুনো দেওয়া ও তালপাখা দিয়ে বাতাস দেওয়া। ধুনোর গন্ধে চারদিক ম ম করতো। পোড়া ছোবড়া ও ধুনোর গ্যাসে চোখ জ্বালা করলেও খুব ভাল লাগতো। ঢাকি পাড়ার ঢাক ও কাঁশি বাজলে পুজোমন্ডব জমে যেত। নতুন জামা কাপড় পরে আমরাও খুব আনন্দ করতাম।
অষ্টমি, সন্ধিপুজো ও নবমীতে পাড়ার মহিলাদের দম ফেলার সময় থাকতো না। তবে তাঁরা ওই কটাদিন বেশ হাসিমুখে সামাল দিতেন। কম পয়সার বাজেট হলেও শুরুতে গ্রামের সব লোকজনদের বসিয়ে খিঁচুড়ী ভোগ খাওয়ানো হতো। দশমীর সন্ধ্যায় ভিসিআর ভাড়া করে সিনেমা দেখানো হতো। সকলে খুব আনন্দ করতেন। ২০০০ সালে বাবার পরলোকগমণে সেই পুজো বন্ধ না হয়ে চলে আসে শ্রীরামপুরের বাড়িতে। চলে আসছে ৫৯ বছর ধরে।

পুজোয় আজও বহুজনকে বসিয়ে ভোগ খাওয়ানো হয় নবমীর দুপুরে। ষষ্ঠীর রাতে আগমনী উপলক্ষ্যে গান-বাজনার আসর বসে। শহরের সংস্কৃতিকপ্রেমীরা আসরে অংশগ্রহণ করেন। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করা হয়। নবমীর সন্ধ্যায় বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে জলসার আয়োজন করা হয়।
বিজয়া দশমীর দিনে পাড়া-পড়শী, আত্মীয়-পরিজনদের সধবা মহিলারা সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন। সিঁদুর হল নারী শক্তির পরিচায়ক। একে অপরে সিঁথিতে, কপালে, গালে সিঁদুর দিয়ে পরষ্পরের মধ্যে সম্প্রীতির যে ছবিটা ফুটে ওঠে সেটা এক অনন্য পুজো স্পেশাল। এরপরে আবির খেলাকে কেন্দ্র করে ছুটোছুটি, হুটোপুটি, হৈচৈ, আবিরে মাখামাখি পুজো স্পেশালকে অন্য মাত্রা দেয়।

দশমীতে ঠাকুর গঙ্গায় বিসর্জনের পরে গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম, সমবয়েসীদের সঙ্গে কোলাকুলি, ছোটদের মাথায় হাত দিয়ে ভালবাসা জানানো পুজো স্পেশাল হিসেবে পরম্পরা বলেই বিবেচিত হয়ে আসছে আজও।

ফলো করুন: আমাদের খবরের কাগজ/ ওয়েবসাইট/ ফেসবুক পেজ
